মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্রমণ – ভ্রমণের স্মৃতিকথা (পর্ব-১১.১)

মেঘের রাজ্য সাজেক নিয়ে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে গেছে। কিন্তু আমার এখনো সাজেক যাওয়া হয় নাই। ঠিক মানতে পারছিলাম না। সাজেক যাওয়ার সুযোগ পাওয়া মাত্র তাই দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে রাজি হয়ে গেলাম।

সাজেকে কিভাবে যাবো, কই থাকবো, কি কি দেখবো তা নিয়ে বিস্তারিত প্ল্যান করা শুরু করলাম। ফেসবুকে সাজেক নিয়ে লেখা প্রচুর পোস্ট পড়লাম। ঠিক করলাম, সাজেকে দুই রাত থেকে লংগদু থেকে পানি পথে কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দিয়ে রাঙ্গামাটি শহরে যাবো। সেখানে দুই রাত থেকে এরপর ঢাকা ফিরবো।

ঢাকা থেকে সাজেক যাওয়ার সময় বেশিরভাগ মানুষ খাগড়াছড়ি নেমে এরপর জীপে উঠে। কিন্তু আমাদের জীপ দিঘীনালার হওয়ায় আমরা সরাসরি দিঘীনালার বাস ঠিক করলাম।

২১ আগস্ট, ২০১৬। সারাদিন বৃষ্টি পড়েছে। আমাদের বাস শান্তি পরিবহন রাত ৯টায় কলাবাগান থেকে ছাড়ার কথা থাকলেও ছাড়তে ছাড়তে ১০টা বেজে গেলো। সারাদিন চোখে ঘুমের রেশ থাকলেও বাসে উঠার পর ঘুম চলে গেল। বন্ধুদের সাথে হাসি-ঠাট্টা আর মোবাইলে গান শুনতে শুনতে সময় পার হয়ে যাচ্ছিলো। বাসে মোট যাত্রী সংখ্যা ২৪ যার মধ্যে আমরাই ১৪ জন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড চার লেন হওয়ার পর জ্যাম নেই বললেই চলে। রাতের অন্ধকারে সাঁই সাঁই করে বাস ছুটে চলছে, সাথে আমরাও। রাত দু’টোয় খাবার বিরতি দেওয়া হলো। ফেনীর পার হয়ে বাস ঢাকা-চট্রগ্রাম রুট ছেড়ে বামে ঢুকে গেলো। এই রুটে আগে কখনো যাওয়া হয় নাই, বেশ আগ্রহ নিয়ে নড়েচড়ে বসলাম। যদিও কিছু সময় পরই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ টের পেলাম বাস পাহাড়ী রাস্তায় টার্ন নিচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেল। ঘটনা কি জানতে ড্রাইভারের কাছে গেলাম। জানতে পারলাম এই রাস্তা নাকি শুধু শান্তি ও ইকোনো পরিবহন ব্যবহার করে।

চোখ থেকে ঘুম চলে যাওয়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখছিলাম। বাস এত টার্ন নিচ্ছিলো দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল। বাধ্য হয়ে পিছে জাপান সিটের মাঝ বরাবর বসে পড়লাম। সামনে তাকিয়ে মনে হচ্ছিলো রোলার কোস্টারে অ্যাঁছি। ড্রাইভারের সিটের পিছনে ছোট বসার জায়গা ছিলো। একটু পর ওই সিট খালি হলো। বাকি পথ সেখানেই বসে ছিলাম। বাস জার্নির এটাই বেস্ট পার্ট।

ভোরবেলা দিঘীনালা নেমে দেখি তখনো চারিদিকে কুয়াশা। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা জীপ ড্রাইভার শিবু ভাই আমাদের বনবিহারের গেট থেকে রিসিভ করলো। নাস্তা করার জন্য বাসষ্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলাম।

হাজাছড়া ঝর্ণা দেখতে যাই

নাস্তা করে হাজাছড়া ঝর্ণা দেখতে রওনা হলাম। দিঘীনালা বাসষ্ট্যান্ড থেকে ২০ মিনিটের পথ। বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্পের কিছুটা আগে মূল রাস্তা থেকে নেমে ঝিরি পথ ধরে ১০-১৫ মিনিট হাঁটতে হয়। সমতল এবং সহজ রাস্তা হওয়ায় সবাই যেতে পারে।

অনেকদিন পর ঝিরি পথ দেখে মন খুশি হয়ে গেল। আমাদের সাথে থাকা গাইড হিসেবে জীপের হেল্পার ছিলো। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম ঝিরি পথ দিয়ে ঝর্নায় যাওয়া যাবে না? বললো, যাবে কিন্তু সময় বেশি লাগবে। ঝিরিপথ বাদ দিয়ে আমরা শর্টকাট পথ ধরলাম।

কিছুদূর হাঁটার পর দূর থেকে পানি পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম। পায়ের গতি বেড়ে গেলো। গাছে ঢাকা একটা মোড় ঘুরে দেখি সামনে বিশাল ঝর্ণা। অনেক উঁচু থেকে পানি পড়ায়, অনেক দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিলো। গতকাল রাতে বৃষ্টি হওয়ায় অনেক পানি ছিলো। ঝর্নাটির আরেক নাম ‘শুকনাছড়া ঝর্ণা’ শীতকালে যার প্রমাণ মিলে। আমাদের ভাগ্য বেশ ভালো ছিলো। একে তো প্রচুর পানি পেয়েছি বাড়তি হিসেবে রংধনুর দেখা পেলাম।

হাজাছড়ায় রংধনু
হাজাছড়ায় রংধনু

পানি দেখে আমি নিজেকে সংবরন করতে পারলাম না। ঝর্ণায় নেমে পড়লাম। বন্ধুরা অবশ্য কেউ নামলো না। এমন পানি দেখে গোসল না করে কিভাবে থাকে বুঝলাম না।

হাজাছড়া ঝর্ণার ভিডিও

পাহাড় বেয়ে হাজাছড়া ঝর্নার উপরে যাওয়া যায়। তবে যাওয়ার পথ বেশ দুর্গম। সহজে উঠা গেলেও নামার সময় ধরার কিছু থাকে না। বেশ কিছু দুর্ঘটনাও নাকি ঘটেছে। মনের স্বাধ মিটিয়ে গোসল করে, ছবি তুলে, ঝর্ণা দেখে আমরা আবার জীপের কাছে চলে এলাম।

সাজেক যাত্রা শুরু

অপেক্ষার পালা শুরু হলো। আর্মিদের সাথে ১০.৩০ টার এসকোর্টে যেতে হবে। আগে দিনের যেকোন সময় জীপ নিয়ে যাওয়া যেত। শান্তি বাহিনী আর্মির বিগ্রেডিয়ারের জীপে আগুন দেওয়ার পর নতুন নিয়ম হয়েছে। আর্মি এসকোর্ট ছাড়া কোন ট্যুরিস্ট জীপ যেতে পারে না।

সকাল ১০ টায় আর্মি ক্যাম্পে খাতায় সই করে বাঘাইহাট বাজারে গেলাম। পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, ছোলার দোকান দেখে সবাই হামলে পড়লো। ১ টাকার পেঁয়াজু, ৩ টাকার আলুর চপ-বেগুনি খেয়ে চোখ পড়লো ডাবের দোকানে। ৪০ টাকায় ডাব কিনলাম নাকি পানি তা অবশ্য বোঝা গেলো না। কোন স্বাদ নাই।

আর্মির এসকোর্ট গাড়ি আসলে এক লাইনে সব জীপ চলা শুরু করলো। এসকোর্টের একটা জীপ থাকে সবার সামনে, আরেকটা সবার পিছে। কয়েকজন জীপের ছাদে চলে গেলো। কথিত আছে, সাজেক যেতে জীপের ছাদে না বসলে নাকি জার্নির আসল মজা পাওয়া যায় না। তবু দুপুরের তপ্ত রোদে ছাদে গেলাম না। তাছাড়া সারারাত জেগে থাকায় বেশ ঘুম পাচ্ছিলো।

ফেসবুকে সাজেকের রাস্তার ছবি দেখেই সাজেক আসার জন্য ইচ্ছা বেড়ে গেছিলো। কিন্তু জীপে উঠার পর তেমন কোন উত্তেজনা কাজ করে নাই। বান্দরবানের পাহাড়ী পথে জীপে চলতে চলতে পাহাড়ী পথের মজা গায়ে সয়ে গেছে। কিছু সময় পরই ঘুমিয়ে গেলাম।

অনেকটা সময় ঘুমানোর পর জেগে উঠার সাথে সাথেই অঘটন ঘটলো। পাহাড়ী এক খাড়া ঢালে জীপের গিয়ার আটকে গেলো। এই জীপগুলোর ব্রেক হয় মারাত্মক। জীপ থেমে গেলো, নিচের দিকে নামলো না। আমাদের জীপে জ্যাম না থাকায় পিছের জীপ থেকে জ্যাম (মোটা কাঠের গুড়িঁর মত যা চাকায় দিলে ব্রেকের কাজ করে) এনে চাকায় দেওয়া হলো। হঠাৎ এমন ঘটনায় হৃৎপিন্ড যেন বন্ধ হয়ে গেলো।

ড্রাইভার কয়েকজনকে নামতে বললো। একেবারে খাড়া ঢালে নামতে গিয়ে এক বন্ধু প্রায় পরে যাবে এমন অবস্থা। সাবধানে না নামার জন্য বকা দিতে দিতে নামতে গিয়ে দেখি আসলেই তাল সামলানো কঠিন। গিয়ার ঠিক হয়ে গেলে আবার চলা শুরু হলো। ড্রাইভার বললো, পাঁচ বছর হলো সাজেক রুটে গাড়ি চালাই। কখনো এমন হয় নাই!

আমার তখন কলিজা শুকিয়ে গেছে। এমন ভয়ের মধ্যেও একটা সিএনজিকে আমাদের জীপ ওভারটেক করতে দেখে না হেসে পারলাম না। মাত্র চলা শুরু হওয়ায় জীপ তখনো স্পিড পাচ্ছিলো না। যাই হোক জীপ চলা শুরু করায় স্বস্তি নিয়ে বসলাম। আর সাথে সাথেই আমার অঘটন। জীপের গ্রিলের সাথে বাধা এক্সটা টায়ার বিকট শব্দে ব্রাস্ট হলো। আত্মা বের হয়ে যাবে এমন এক অবস্থা। বাকি রাস্তা আমার বেশ ভয়েই কাটলো। খাড়া ঢাল দেখলেই ভয় লাগছিলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে আর কোন অঘটন ছাড়া সুস্থভাবে সাজেক পৌঁছালাম।

সাজেকে আমাদের রিসোর্টটি রুইলুই পাড়ায় মারুয়াতি কটেজ(আসল নাম জানা নেই, এইনাম আমার নিজের দেওয়া)। কটেজ দেখে আমরা খুব খুশি। দোতলা কটেজ। দোতলায় তিনটা রুম, নিচতলায় ২ টা রুম। উপরের একটা রুম থেকে লুসাই পাহাড়ের দারুন ভিউ পাওয়া যায়। রুম থেকে সূর্যোদয় দেখা যাবে। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে আগামী দুইদিন এই পুরো রিসোর্টটি আমাদের!

রুমে ব্যাগ রেখে রিসোর্টের মালিককে ধরলাম আশেপাশে কোন পুকুর বা ঝর্ণা আছে নাকি। আমরা সেখানে গোসল করবো। কটেজের প্রতিটা রুমে এটাচাড বাথ থাকলেও পাহাড়ে এসে কলের পানিতে গোসল করার মানে নেই। জানা গেলো ঝর্ণা আছে তবে তা দুই-আড়াই ঘন্টার হাঁটা পথ। কিন্তু কাছেই একটা কুয়া আছে। সেখানে গোসল করা যাবে। আমরা তো মহাখুশি। কুয়াতে যেতেও নাকি মিনিট পাঁচেক লাগবে। সবাই উনার পিছে পিছে হাঁটা ধরলাম।

পাঁচ মিনিটের পথ দশ মিনিট পরেও শেষ হয় না দেখে এক বন্ধু কটেজে ফিরে গেলে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, যেই গরম, গোসল করে কটেজ যেতে যেতে দুই দফা গোসল হয়ে যাবে। পিচঢালা রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তা। তারপর পাহাড়ী ঢাল বেয়ে নামার পর কুয়ার দেখা মিললো। কুয়া দেখে সবাই বললাম হেঁটে আসা সার্থক।

কুয়ার সৃষ্টি ঝর্ণার পানি থেকে। খাবার পানি ও গোসলের জন্য দুটো আলাদা কুয়া রয়েছে। খাবার পানির কুয়াটা অগভীর এবং ছোট। গোসলের কুয়াটা বেশ গভীর। কুয়া থেকে এক মগ পানি গায়ে ঢালতেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো। পানি অসম্ভব ঠান্ডা। ইচ্ছামত গোসল করে কটেজের পথ ধরলাম। যাওয়ার পথ শুধু নামার ছিলো। এখন ফিরতে পথে ঢাল বেয়ে উঠতে হবে। তবে এমন পানিতে গোসল করার জন্য এতটুকু কষ্ট মেনে নেওয়াই যায়।

কুয়ার পানিতে গোসল করে রিসোর্টে আসতে আসতে সবাই ঘেমে গেলাম। ফলাফল রিসোর্টে ঢুকে আবার গোসল করতে হলো। সবার পেটে ততক্ষনে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে। খাবার খেতে রিসোর্টের পাশে এক রেস্টুরেন্টে বসলাম। খাবারের অর্ডার আগেই দেওয়া ছিলো। আমরা বসতেই গরম গরম ধোঁয়া উঠা ভাত, ঝাল মুরগি, পাহাড়ী সবজি আর ডাল চলে আসলো। মুরগিতে অসম্ভব ঝাল ছিলো। পাহাড়ী মরিচের ঝাল অনেক বেশি। আমার সমস্যা না হলেও বাকিদের খেতে বেশ কষ্ট হলো। খাওয়া শেষে লম্বা একটা ঘুম দিতে কটেজে ঢুকলাম। সাজেকে যেহেতু দুই রাত থাকবো আজ ঘুম দেওয়াই যায়।

আমার ঘুম ভাঙ্গলো সূর্যাস্তের সময়। ঘুম এত আরামের ছিলো যে উঠতেই ইচ্ছা করছিলো না। আমাদের কটেজের বিপরীতে বিশাল এক গাছ। গাছের নিচে বসার ব্যবস্থা আছে। সেখানে বসে কিছু সময় পাহাড়ী বাতাস খেলাম। ১৮০০ ফুট উঁচুতে মৃদু মন্দ পাহাড়ী বাতাসে দারুন লাগছিলো।

সাজেকের রাস্তাগুলোতে স্ট্রিট লাইট আছে। ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারের দেখা পাওয়া তাই দুষ্কর। তবে হেলিপ্যাডের দিকে যেতে থাকলে কিছু জায়গায় অন্ধকার পাওয়া যায়। আর সেখানেই আসল মজা। আকাশ পরিষ্কার থাকায় অসংখ্য তারা চোখে পড়লো এবং দেখা মিললো মিল্কিওয়ের। এতটাই স্পষ্ট প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিলো না। আমরা সাজেকে যে দুই রাত ছিলাম। দুই রাতই স্পষ্ট মিল্কিওয়ের দেখা পেয়েছি।

রুইলুই পাড়া থেকে হেলিপ্যাড বেশ দূরে। আমরা যেদিন যাই তখন জোছনা ছিলো। জোছনা বিলাস করবো বলে হেলিপ্যাডে উঠে আমার থ! আকাশে থালার মত বিশাল এক চাঁদ! চাঁদের আলোয় পুরো হেলিপ্যাড আলোকিত! হেলিপ্যাডে থেকে চাঁদটাকে খুব কাছে এবং বড় মনে হচ্ছিলো। আমরা লাইন ধরে চাঁদের মুখোমুখি বসে পড়লাম। এখন হবে চন্দ্রস্নান!

রাতের খাবার না খেয়ে বের হওয়ায় বেশি সময় চন্দ্রস্নান করা গেলো না। রাতের খাবার খেয়ে রিসোর্টে চলে গেলাম। রিসোর্টের বারান্দা থেকে চাঁদের আলো দেখতে দেখতে গল্প, আড্ডা-গান চলতে লাগলো। শেষ হলো সাজেকে প্রথম রাত।

কটেজের রুম থেকে সূর্যোদয় দেখা
কটেজের রুম থেকে সূর্যোদয় দেখা

ভোরে এল্যার্মের শব্দে ৪.৩০টায় ঘুম ভাঙলো। রাতে ঘুমাতে দেরি হওয়ায় ভোরে আর উঠতে ইচ্ছে করলো না। আমার রুমের জানালা থেকে সূর্যোদয় দেখা যায়। ঘুম ঘুম চোখে কিছুক্ষন সূর্যোদয় দেখলাম। কয়েকটা ছবি তুললাম। এরপর আবার ঘুমিয়ে গেলাম।

সকালে সবাই যখন নাস্তা করতে গেলো আমি তখন হাঁটতে বের হলাম। সাজেকে বিনোদনের অনেক ব্যবস্থা আছে। রাস্তার দুই পাশে দোলনা, তীর নিক্ষেপ, বসার সুন্দর ব্যবস্থা, পিকনিক স্পট। সহজ যাতায়াত, বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকায় সাজেক এতটা জনপ্রিয়।

একা হাঁটতে হাঁটতে সাজেক “জিরো কিলোমিটার’ মাইলফলকের কাছে চলে গেলাম। সেখানে সেলফি তুললাম। হেলিপ্যাড থেকে রুন্ময় রিসোর্টের ছবি তুললাম। ২০১৬ সালের দিকে সাজেক রুন্ময় রিসোর্টের ছবি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়তো। 

ঘুরাঘুরি শেষে রিসোর্টে আসার পথে বিজিবি ক্যাম্পে গেলাম। গার্ডরত দুই বিজিবির সাথে কথা বলে জানলাম দূরে সবচেয়ে বড় যে পাহাড়, যার আড়াল থেকে সূর্য বের হয়, তার নাম ‘লুসাই পাহাড়।’ পাহাড়টা ভারতের। বাংলাদেশ-ভারত বর্ডারের নাম, মিজোরাম বর্ডার। রাতে নাকি দূরে ভারত বর্ডারের ক্যাম্পের আলো দেখা যায় (যদি ঠিকভাবে লক্ষ্য করা যায়)। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যেকার পতাকা বৈঠকে সাজেক থেকে দুর্গম পথ ধরে যেতে আসতে মোট তিনদিন সময় লাগে।

মিশন কংলাক পাড়া

কংলাক পাড়ায় সবাই সূর্যোদয় দেখতে যায়। আর আমরা রওনা হলাম সকালের নাস্তা করে। সাজেক থেকে হাঁটা পথে কংলাক যেতে সময় লাগে ৪৫ মিনিট। জীপ দিয়ে কংলাক পাড়ার একদম নিচ পর্যন্ত যাওয়া যায়। আমরা জীপ দিয়ে গেলাম। জীপ থেকে নেমে ১০ মিনিটের বেশ ঢালু একটা পথ বেয়ে উঠেই পেয়ে গেলাম, কংলাক পাড়া।

কংলাক পাহাড়ে উঠার ভিডিও

সাজেকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় সিপ্পু পাহাড়ে কংলাক পাড়া অবস্থিত। সিপ্পু পাহাড় সাজেক তো বটেই পুরো রাঙামাটি জেলার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়, উচ্চতা ২৮০০ ফুট। কংলাকের চূড়া থেকে পুরো সাজেকের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। 

কংলাকে পাংখো আদিবাসিরা থাকে। পাড়ার অনেকে বাংলায় কথা বলতে না পারলেও ইংরেজিতে বেশ দক্ষ। আমাদের সাথেই একজন ইংরেজি বেশ স্বতর্ফূতভাবে কথা বলছিলো। ভারতের মিজোরাম রাজ্য এখান থেকে বেশ কাছে। হাঁটা পথে ২ ঘন্টা লাগে। আদিবাসীদের অনেকেই ভারতের মিজোরাম রাজ্যে গিয়ে পড়াশুনা করে।

পাহাড়ী কলা, পেয়ারা, জাম্বুরা ভর্তা খেলাম। পাহাড়ী মরিচ যে কত ঝাল হতে পারে টের পেলাম। খেতে বেশ মজা আবার ঝালও সহ্য করার মত না। কংলাকে একটা রিসোর্ট আছে, রক প্যারাডাইস। সেখানে গিয়ে দেখি কোন মানুষ নেই। চারিদিকে সুনসান নিরবতা। শুধু দূরে নাম না জানা এক পোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে। পাহাড়ের নিরবতায় সে শব্দ বড্ড কানে বাজে। রিসোর্টের বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে পড়লাম। দীর্ঘ সময় সেখানে বসে রইলাম। কেমন যেন মোহ হচ্ছিলো। উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না।

সাজেকের রাস্তা ধরে হাঁটলে মজা হচ্ছে একপাশে বাংলাদেশ, অন্যপাশে ভারত। ভারতের লুসাই পাহাড়ের তুলনায় বাংলাদেশের পাহাড়গুলো খুবই ছোট। সাজেকের রাস্তায় হেঁটে, বিকেলে চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখে, পাহাড়ের মানুষদের সাথে গল্প করতে করতে কিভাবে যে দুইরাত কেটে গেলো টেরও পাই নাই। তবে দুঃখের কথা হচ্ছে, সাজেক থেকে মিল্কিওয়ে দেখতে পারলেও মেঘ দেখতে পারি নাই। তবু যা দেখেছি আলহামদুলিল্লাহ।

তৃতীয় দিন সকাল ১১টার এসকোর্টে সবাই জীপে উঠলাম। এবার রাস্তার আসল আনন্দ উপভোগ করতে জীপের ছাদে বসলাম। পাহাড়ী রাস্তায় আঁকাবাঁকা টার্নগুলোতে মজা যেমন লাগছিলো, তেমন ভয় লাগছিলো। নিচে পড়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না!

সাজেক ঘুরে সবাই খাগড়াছড়ির দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে যায়। কিন্তু আমরা যাবো লংগদু। সেখান থেকে ট্রলারে করে কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দিয়ে যাবো লাল পাহাড়ের দেশ রাঙ্গামাটি।

সাজেক ভ্রমণ সংক্রান্ত প্রয়োজনে ফোন করুন 01831551904 নাম্বারে

আপনার মতামত জানান
SHARE