কাঞ্চনজঙ্ঘার খোঁজে পঞ্চগড় – ভ্রমণের স্মৃতিকথা (পর্ব-১)

সন্ধ্যায় হঠাৎ রাকিন ফোন দিয়ে বললো,

– পঞ্চগড় যাবি? কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে যাবো।

ফেব্রুয়ারি মাসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার কথা শুনে কিছুটা অবাক হলেও না করলাম না। ঘুরতে যাওয়াতে আমার কখনোই না থাকে না।

আমি যাবো শুনে বললো, তাহলে গাবতলী চলে যা। নাবিল পরিবহনে তিনটা টিকেট কেটে রাখ। আমি আসতেছি! যাহ বাব্বা। আমি না গেলে ওর টিকেট কাটতো কে তাহলে? আমার বাসা মিরপুর-১। আর রাকিনের মিরপুর-১১।

ব্যাগ গুছিয়ে গাবতলী চলে গেলাম। শেষ মুহূর্তে টিকেট পাওয়া নিয়ে আশংকা থাকলেও সমস্যা হলো না। রাকিন আর সুপ্ত আসলো বাস ছাড়ার অল্প কিছু সময় আগে। ২০১৬ সালের প্রথম ভ্রমণ শুরু হলো ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলা দিয়ে…

নাবিল পরিবহনে করে যাত্রা শুরু
নাবিল পরিবহনে করে যাত্রা শুরু

ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় তেমন শীত নেই কিন্তু শীতের রাজ্যে যাবো দেখে সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়েছিলাম। তবু বাস ঢাকা থেকে বের হওয়ার পরই জমে যাওয়ার মত অবস্থা হলো। ঘুমের চেষ্টা করলেও হাঁড় কাঁপানো শীতে ঘুম পাচ্ছিলো না। বাড়তি হিসেবে ছিলো বাসের স্পিকারে একটানা গান।

ঘোর লাগা তন্দ্রাচ্ছন অবস্থায় হঠাৎ হঠাৎ চোখ খুলে দেখি কুয়াশায় রাস্তার কিছুই দেখা যায় না। ড্রাইভার বেটা কিভাবে দেখছিলো সে এক রহস্য!

খুব সকালে বাস আমাদেরকে যেখানে নামিয়ে দিয়ে গেলো সেখানে জনমানবের কোন চিহ্ন নেই। ঘন কুয়াশায় কয়েক হাত দূরে কিছু দেখা যায় না। এরমধ্যে আমি স্যান্ডেল পড়ে আছি। পায়ের তালুতে লাগা ঠান্ডা মাথায় বাড়ি দিচ্ছিলো যেন।

তিন রাস্তার মোড়ে কিছু সময় দাঁড়াতে ব্যাটারি চালিত ভ্যান আসলো। আমরা পা ঝুলিয়ে বসলাম। যতই ভ্যান জোরে চলে, ততই আমি বরফের মমি হচ্ছিলাম। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি পুরোপুরি মমি হওয়ার আগেই বাসায় পৌঁছে যাই।

পঞ্চগড় রাকিনের দাদাবাড়ি। হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করে আমরা আশপাশ ঘুরে দেখতে বের হলাম। রাকিন কোথা থেকে এক বাইক নিয়ে আসলো। রাকিনের বাইক চালানোর উপর ভরসা না থাকায় প্রথমে সুপ্তকে নিয়ে বের হলো। মিনিট বিশেক পরে সুপ্ত এসে রিপোর্ট দিলো কয়েকবার রাস্তা ছেড়ে নেমে যাওয়া আর একবার পুকুরে নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া ভয়ংকর কিছু করে নাই। ড্রাইভার হিসেবে ভালোই। সুপ্ত’র কথায় আশ্বস্ত হয়ে এবার আমিও বাইকে উঠলাম। তিনজন মিলে শুরু হলো গ্রাম ঘুরে বেড়ানো।

দুপুরে গোসল করলাম স্যালো মেশিনের পানিতে। এই পানিতে গোসল করার যে কি আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। যারা গোসল করেছে তারাই জানে।

দুপুরের খাবার খেয়ে আবার ঘুরতে বের হলাম। বিভিন্ন আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছি আর পেট ভরে খাচ্ছি। ২ রাত, ৩ দিন পর বাসায় গিয়ে দেখি ওজন ৪ কেজি বেড়ে গেছে। দিনে গড়পরতায় ৬-৮ বার খাওয়া হতো আর প্রতিবারই হালকা নাস্তার নামে বেশ ভারী খাবার!

রাতে গেলাম স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখতে। বড় বড় ফার্মের মুরগী যে গরু/ছাগলের মত কেটে আলাদা বিক্রি হয় সেবারই প্রথম জানতে পারি। পরে অবশ্য মিরপুর-১ কাঁচা বাজারেও এই জিনিস দেখি।

দ্বিতীয় দিন আমরা যাই বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট। লেগুনা রিজার্ভ করে এশিয়ান হাইওয়ের ঝাঁ চকচকে রাস্তায় দুপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রথমে থামি সমতল চা বাগানে। সিলেটের চা বাগান আগে দেখা হয়েছে। এবার দেখলাম পঞ্চগড়ের সমতলের চা বাগান।

সমচল চা বাগান

চা বাগানে এসে মজার এক জিনিস দেখলাম। বাংলাদেশ-ভারত সীমানা। এবং ভারতীয়রা চা বাগানে কাজ করছে। চা বাগানের ভিতরে সীমানা পিলারা দেখা সেখানে সেলফি তুলে রওনা হলাম বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে।

কত কাছে তবু
নাহি যায় ছোঁয়া
দূর দর্শনে, নাহি মেটে
প্রাণের তৃষা

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত এক সুখানুভূতি হয়। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিন ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া হয়েছে। এবার বাংলাদেশের সর্ব উত্তর বাংলাবান্ধাকেও দেখা হলো।

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট

জিরো পয়েন্টে বেশকিছু ছবি তুলে চলে গেলাম তেঁতুলিয়া ডাক বাংলোতে। সেখানে দেখা মিললো মহানন্দা নদীর। দুঃখজনক হলেও সে নদীতে পানির চেয়ে বালু ছিলো বেশি। আমরা নদীর বুক জুড়ে বেশকিছু সময় হেঁটে বেড়ালাম। ফিরতিপথে রাকিনের এক আত্মীয়ের বাড়িতে দুপুরের খাবার খেলাম বিকালে।

তারপরের সময়টুকু রাকিনের বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়ি আর আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়েই কাটলো। আমরা ঢাকার পথ ধরলাম ১৩ তারিখ রাতে হানিফ বাসে করে…

১৮ মার্চে কুমিল্লায় কেনো গিয়েছিলাম জানতে চোখ রাখুন ওয়েবসাইটের পর্দায়…

আপনার মতামত জানান
SHARE