হন্টন প্রজেক্ট । দিন-১৪ঃ মানিকদী টু বাউনিয়া

মিরপুর ফ্লাইওভার হওয়ার পর ভার্সিটি যাওয়ার জন্য কালসী রুটটা ইউজ করতাম। তো এই পথে যাওয়ার সময় ইসিবি চত্বরে দেখতাম মানিকদীর দিকে একটা রাস্তা আছে। তখন থেকেই খুব আগ্রহ ছিলো এই পথ দিয়ে কই যাওয়া যায় তা জানার। ঢাকার রাস্তায় লং ডিস্টেন্স হাঁটাহাঁটি শুরু করার পর থেকে ঠিক করি হেঁটেই একদিন এক্সপ্লোর করে আসবো। অনেকদিন থেকে ইচ্ছাটা থাকলেও পূরন হচ্ছিলো না। অবশেষে সেই দিন আসলো।

সাজেক ট্যুর থেকে আসার পর টানা তিনদিন ঘর থেকে বের হই নাই। মাথা এমনিতেই হ্যাং হয়ে ছিলো। চতুর্থদিনে এসে আর পারলাম না। বিকালে বের হয়ে গেলাম। বাসা থেকে ইসিবি পর্যন্ত হাঁটার ইচ্ছা না থাকায় মিরপুর ১০ পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে এরপর বাসে উঠবো ঠিক করলাম। সারাদিন অনেক রোদ থাকলেও বিকালের দিকে আবহাওয়া ভালোই ছিলো। বিআরটিসির আর্টিকুলেটেড বাসে উঠে ফেসবুকিং শুরু করলাম। আজ কোন তাড়া নেই। বাস ধীরে সুস্থেই যাক।

বিআরটিসি বাস মানেই নানা কাহিনী। মিরপুর-১০ থেকে ইসিবি চত্বর আসতে আসতেই কতকিছু দেখে ফেললাম। সে যাই হোক ইসিবি চত্বর থেকে মানিকদীর পথে হাঁটা শুরু করলাম বিকাল ৪ টা ৪৯ মিনিটে। প্রথমে কানে হেডফোন লাগিয়ে কিছুক্ষন হাঁটলেও যেই রোড তাতে এইভাবে হাঁটা যাবে না বুঝে হেডফোন খুলে ফেললাম। রাস্তার অবস্থা চরম বাজে। ঠিকমত হাঁটার উপায় নেই। রিকশা, অটো, সিএনজি পারলে গায়ে উঠিয়ে দেয়। আর ভাঙা রাস্তায় পানি জমে এমন অবস্থা হয়েছে যে একজনের পিছে আরেকজন লাইন দিয়ে হাঁটতে হয়।

রাস্তার এমন খারাপ অবস্থায় রাস্তার আশপাশ দেখবো কি, রাস্তার দিকে তাকিয়েই কুল পাচ্ছিলাম না। তাও যতটা সম্ভব এদিক ওদিক দেখছিলাম। কিছুদূর হাঁটাতেই সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট চোখে পড়লো। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢোকার উপায় নেই। নাহলে হয়ত ঢুঁ মেরে আসতাম। এর কিছুক্ষন পরে মানিকদী বাজারে চলে আসলাম। বাজারের রাস্তার অবস্থা আরো খারাপ। অটোগুলো কিভাবে চলতেছে তা এক বিস্ময়!

মানিকদী পার হলে বালুঘাট। এই বালুঘাটের নাম কত দেখেছি বিভিন্ন বাসে। কিন্তু কোথায় যে এই বালুঘাট তা জানতাম না। আজকে জানতে পারলাম। যদিও জানাটা তেমন সুখকর হলো না। রাস্তার অবস্থা খুবই বাজে। বৃষ্টির পানি জমে অবস্থা আরো খারাপ। বালুঘাট পার হয়ে দেখলাম বিভিন্ন দোকানে নাম লেখা বারনটেক। এই জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ খোলা জায়গার দেখা মিলছিলো। যদিও বেশি বড় জায়গা না। তবে যতটুকু দেখা যায় তাতেই দূর আকাশে পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের দেখা পাওয়া যাচ্ছিলো।

হাঁটতে হাঁটতে এবার আসলাম বাইগারটেক। কি অদ্ভুত অদ্ভুত সব নাম। বাইগারটেকে বাউনিয়ার মত বিশাল বাউন্ডারী দেওয়া রোড আছে। আমি জানতাম যে এইপথ দিয়ে বাউনিয়া যাওয়া যায়। তাই বিশাল ওয়াল দেখে ভাবলাম বাউনিয়া চলে আসছি। পরে আবার হিসাব মেলাই এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে গেলে বাউনিয়া তো বহুদূর, এদিক দিয়ে তো এতকাছে হওয়ার কথা না।

বাইগারটেকে কিছুদূর হাঁটার পর দেখলাম বিশাল এক ঘরের মত জায়গা। বাইরে সাইনবোর্ড টানানো “সিদ্দিক ব্যডমিন্টন ইনডোর স্টেডিয়াম।” এত ভিতরে এই জায়গা দেখে অবাক হলাম। রাস্তা থেকে নেমে ভিতরে গিয়ে দেখি স্টেডিয়ামটা বেশ ভালোই বড়। তবে কেউ নাই। এক ছেলে চেয়ারে বসে বসে ঝিমাচ্ছে। আমি ছবি তুলতেছি দেখে একবার তাকালো। আমি ভাবলাম কিছু হয়ত বলবে কিন্তু কিছু বললো না। আমিও ছবি তুলে আবার হাঁটা দিলাম।

বাইগারটেক পার হতে চোখে পড়লো দোকানের ঠিকানায় বাউনিয়া লেখা। বাউনিয়া রোড দিয়ে যাওয়া টেম্পুগুলোরও দেখা পেলাম। বুঝতে পারলাম যে আমি ঠিক পথেই আছি। অবশ্য এতক্ষন ধরে আমি অটো ফলো করেই হাঁটছি। কারন পথে অনেক গলি ছিলো কোনটার পর কোনটায় যাবো বুঝার জন্য অটো দেখছি। অটোর রাস্তা দিয়ে গেলে বাউনিয়া পাওয়া যাবে আমার এই থিওরী ঠিক ছিলো।

মধ্য বাউনিয়ায় এসে দেখি প্রায় আধাঘন্টা হাঁটা হয়ে গেছে। একটা দোকানে চিংড়ির মাথা আর হালিম বিক্রি করতে দেখে সেই দোকানে ঢুকলাম। হালিম দিতে বলে বসতে যাবো তখন বললো, হালিম ৬০ টাকা। হালিম ৬০ টাকা শুনে জিজ্ঞাসা করলাম, হালিমে কি দেন? বলে গরুর মাংস। অপরিচিত এলাকায় ৬০ টাকা দামের হালিম খেয়ে রিস্ক নিতে চাইলাম না। গরু দেয় না কি দেয় কি জানে। আর দোকানে কোন কাস্টমারও ছিলো না। তবে মাত্র বিকাল হওয়ায় হয়ত কাস্টমার ছিলো না। তবে আমি রিস্ক নিলাম না। বের হয়ে আবার হাঁটা দিলাম।

হাঁটতেছি হাঁটতেছি কিন্তু বাউনিয়া আর আসে না। কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়লাম। যা দেখি তা দেখেই মনে হয় এইতো মনে হয় বাউনিয়া চলে আসছি। কোন গলি দেখলে মনে হয় এই গলির শেষ মাথায় গেলেই হয়ত বাউনিয়ার দেখা পাওয়া যাবে। প্রায় ৫০ মিনিট পর বিকাল ৫ টা ৪০ মিনিটে হুট করেই বাউনিয়া চলে আসলাম। একটু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলাম। সামনে দেখি জ্যাম। সিএনজি, অটো, রিকশা, বাইক এমনকি মানুষও দাঁড়িয়ে আছে। আর সবার সামনে পুলিশ দাঁড়ানো। ঘটনা কি বুঝতে সামনে গিয়ে দেখি বাউনিয়া চলে আসছি।

আজকে আমেরিকান কূটনৈতিক জন ক্যারি আসবে। তার ফ্লাইট এখন নামবে/উঠবে এমন কিছু। তাই পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে রাখছে। মানুষও যেতে দিচ্ছে না। আমিও কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম। এরপর পুরি খেতে একটা দোকানে ঢুকলাম। পুরি খেয়ে বের হয়ে দেখি রাস্তা ছেড়ে দিবে এমন ভাব। কিছুক্ষন পরেই ছেড়ে দিলো। বাউনিয়ার যেখান থেকে দাঁড়িয়ে প্লেন মাথার উপরে দেখা যায় সেখানে গিয়ে দেখি আজকে মানুষ অনেক কম। কিন্তু পুলিশ আর পুলিশ। বাউনিয়া যখন আসছি তখন প্লেন দেখে যাই চিন্তা করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনেকগুলো প্লেনের ল্যান্ডিং দেখে অবশেষে বাসার পথ ধরলাম।
আজ প্রায় ৫০ মিনিটে হাঁটা হয়েছে ৩ কিলোমিটারের বেশি পথ।

আজকের হাঁটার রুট,
মানিকদী(ইসিবি চত্বর)-> বালুঘাট-> বারনটেক-> বাইগারটেক-> মধ্য বাউনিয়া-> বাউনিয়া

রোজ সোমবার
২৯ আগস্ট, ২০১৬

Feature Image by depositphotos

আপনার মতামত জানান
SHARE