প্রথম সমুদ্র দর্শন – পতেঙ্গা সমুদ সৈকত

    স্কুল জীবন পর্যন্ত আমাকে বাসা থেকে একা কোথাও যেতে দেওয়া হতো না। বাসা থেকে নানা বাড়ি, নানা বাড়ি থেকে বাসা এতটুকুই ছিলো গন্ডি। সেই নানাবাড়িও পায়ে হেঁটে ১০ মিনিটের পথ। গন্ডি ছোট হলেও যতটুকু সময় পারতাম বাসার চারপাশে ঘুরে সময় কাটাতাম। রাস্তার অলি-গলি, ধুলোবালিদের সাথেই সখ্যতা ছিলো বেশি।

    ২০০৯ সালে এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার পর তাহের মামা বললো আমার সাথে চট্টগ্রাম চল। কয়েকদিন ঘুরে আসবি। মামা সরকারী চাকরি করেন সেসময় চট্টগ্রামে পোস্টিং ছিলো। আমারও পড়াশোনা নেই বিধায় বাসা থেকে যেতে দিলো।

    ঢাকা থেকে এর আগে এত দূরে কখনো জার্নি করা হয় নি। ভিতরে ভিতরে খুব উত্তেজিত ছিলাম। বাসে উঠার পর একটুও ঘুমায় নি। আর এখন বাসে উঠার কিছু সময় পরেই ঘুমিয়ে পড়ি। যাই হোক বাস চলছে।

    কুমিল্লা পার হওয়ার পর থেকে মামা বিভিন্ন স্থানের বর্ণণা দেওয়া শুরু করলো। একটা নাম এখনো মনে আছে, লোহাগড়া। চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে চারপাশ দেখছিলাম, এখনো নতুন কোথাও গেলে বিস্ময় নিয়েই চারপাশ দেখি। এই বিস্ময় যেদিন ফুরিয়ে যাবে সেদিনই বোধহয় ভ্রমণ শেষ হবে!

    চট্টগ্রামে সেবার ৬দিন ছিলাম। রেললাইনের কাছেই মামার বাসা। মামার অফিসে এত ব্যস্ততা ছিলো যে আমাকে নিয়ে বের হওয়ার সময় পাচ্ছিলো না। আমার অবশ্য তাতে সমস্যা হচ্ছিলো না। আমি প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের মত করে এদিক-সেদিক ঘুরতাম, কখনো বই পড়েই দিন কাটিয়ে দিতাম। আমার এখনো মনে আছে লোডশেডিং খুব বিরক্ত করতো। সারাদিনই বিদ্যুৎ থাকতো না এমন একটা অবস্থা। গরমও ছিলো প্রচুর।

    অবশেষে একদিন মামার সময় হলো। আজ আমরা পতেঙ্গায় সমুদ্র দেখতে যাবো। কাঠগড় নামক এক জায়গায় এসে মামা বললো, মামার আগের বাসা এখানে ছিলো। এই বাসা থেকে সমুদ্র খুব কাছে। মামারা এখানে থাকলে আমি একাই আসতে পারতাম, মামার জন্য অপেক্ষা করা লাগতো না।

    সেই মাহেন্দ্রক্ষন…

    পতেঙ্গা বিচে যাওয়ার ঢালের কাছে এসে কিছুটা বিরক্ত হলাম। মামাকে সমুদ্র কই জিজ্ঞাসা করতেই মামা মুচকি মুচকি হাসলো। বললো, ঢাল বেয়ে উঠতে থাক।

    তখন কি ছিলো? শৈশব? কৈশোর? কিশোর, মুসা, রবিনের সাথে সখ্যতা ছিলো। হিমুর সাথে সখ্যতা ছিলো। ওদের সাথে কত জায়গাতে যাওয়া হয়েছে। ঢাল বেয়ে উপরে উঠার প্রতিটি পদক্ষেপে সেই গল্পগুলো বাস্তবে পরিনত হচ্ছিলো যেন। সেসময়ে মনে কি চলচ্ছিলো এখন মনে নেই, কিন্তু এখন লিখতে বসে ঠিক এটাই অনুভব হচ্ছে।

    ঢালের শেষ মাথায় আসতেই সমুদ্র উঁকি দেওয়া শুরু করলো। দিগন্ত বিস্তৃত খোলা প্রান্তর আর অথৈ জলের সাগর। ছোট্ট আমার ছোট্ট মনে যে ধাক্কার সৃষ্টি করলো সেই ধাক্কা কখনো ভুলার নয়। কতটা খুশি হয়েছিলাম, কতটা খুশি হয়েছিলাম তা শুধু আমিই জানি…

    তখন ভাটা চলছিলো। বিচে মানুষ ঘোরাঘুরি করছে। একপাশে পেঁয়াজু ভাজা হচ্ছে। একজন দেখলাম ঘোড়া নিয়ে ঘুরছে যদি কেউ ঘোড়ায় চড়তে চায়। এখন এগুলো সাধারন হয়ে গেলেও সেসময় সমুদ্র পাড়ে এত আয়োজন দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

    আমি আর মামা পেঁয়াজু খেলাম, সমুদ্রে পা ভিজালাম, বিচে দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম। ঘন্টাখানেকের মত ছিলাম হয়তো। আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমুদ্রের সাথে সময় কাটানোর মুহূর্ত।

    সমুদ্র দেখা শেষ। তারপর দিন আমি ঢাকায় ফিরে আসি। তবে ঢাকায় ফিরে আসাটা ছিলো আবারো ছুটে যাওয়ার জন্য সাগরে,
    পাহাড়ে, প্রকৃতিতে…

    বি.দ্র. ভ্রমণে গেলে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলুন। কোথাও ফেলার স্থান না ফেলে নিজের সাথে করে নিয়ে আসুন। সবাই সুন্দর পরিবেশ দেখতে ভ্রমণে বের হয় আপনার ফেলে যাওয়া আবর্জনা নয়। নিজে সচেতন হোন, আশেপাশের মানুষকে যতটুকু পারেন সচেতন করুন।

    আপনার মতামত জানান
    SHARE