সিএসই ডিপার্টমেন্টাল ট্যুরে রাঙ্গামাটি – ভ্রমণের স্মৃতিকথা (পর্ব-৪.২)

রাঙ্গামাটি শহরের পর্যটন কেন্দ্রগুলো পানি পথে যাওয়া যায় বিধায় অন্যান্য পাহাড়ী এলাকার মত এখানে চান্দের গাড়ি নেই। এখানে ঘুরতে হয় ট্রলারে করে। গতকালকে আমরা ট্রলার ঠিক করে রেখেছিলাম। সকালের নাস্তা করে ঠিক করে রাখা ট্রলারে উঠলাম।

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আমার স্বাধের হ্যাট উড়ে যাওয়ার আগে একটা সেলফি তুলে নিয়েছিলাম
আমার স্বাধের হ্যাট উড়ে যাওয়ার আগে একটা সেলফি তুলে নিয়েছিলাম

ট্রলারে উঠার আগে বাজার থেকে একটা হ্যাট কিনি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর বন্ধুদের কু-নজরে ট্রলার ছাড়ার কিছুক্ষন পরেই হ্যাটটি বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। ইউসুফ স্যার সাথে সাথে মজা করে বলে, ‘চলো ট্রলার ঘুরিয়ে হ্যাটটা নিয়ে আসি।’

হ্যাট গেছে কিন্তু সানগ্লাস তো আছে এই ভেবে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনকে বুঝ দিয়ে সেলফি তোলা শুরু করলাম। আমরা প্রথমে ঝুলন্ত ব্রিজে যাই। ট্রলার যতই ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে যাচ্ছিলো পানিতে ঢেউ ততই বাড়ছিলো। ঢেউয়ের কারনে মনে হচ্ছিলো যেন সমুদ্রে আছি!

ঝুলন্ত ব্রিজে আনিস স্যারের সাথে সেলফি
ঝুলন্ত ব্রিজে আনিস স্যারের সাথে সেলফি

দূর থেকে ঝুলন্ত ব্রিজ দেখে রাহাত ভাই চিৎকার দিয়ে উঠে ওই যে,“ঝুলন্ত ব্রিজ, ঝুলন্ত ব্রিজ।” এই ঝুলন্ত ব্রিজের ছবি কত দেখেছি। দীর্ঘদিনের ইচ্ছে এখানে আসবো। আজ সে ইচ্ছা পূরন হলো।

পর্যটন মোটেলের কাছে আড্ডা চলছে
পর্যটন মোটেলের কাছে আড্ডা চলছে

ব্রিজে উঠেই সবার ছবি তোলা শুরু করে। ব্রিজের এক মাথায় পর্যটন মোটেল। পর্যটন মোটেল দেখে আফসোস হচ্ছিলো যদি এখানে থাকতাম তাহলে ঝুলন্ত ব্রিজের রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারতাম। ব্রিজে পা দুলিয়ে বসে গানের আসর জমানো যেত। মোটেল থেকে লেকের দৃশ্য ভয়াবহ সুন্দর। সবাই ট্রলারে উঠে পড়ার পরও আমার সেখান থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিলো না। এত সুন্দর জায়গা ছেড়ে কিভাবে এত তাড়াতাড়ি উঠি!

ঝুলন্ত ব্রিজ দেখা শেষ এখন যাবো শুভলং ঝর্না দেখতে। যাওয়ার পথে পেদা টিং টিং-এ নেমে বিখ্যাত ব্যাম্বো চিকেনসহ দুপুরের খাবারের অর্ডার দিলাম। পথে বৌদ্ধমন্দির পড়লো। আমরা দূর থেকে দেখলাম। ঝর্নায় বেশি সময় কাটাবো ভেবে এখানে নামলাম না।

শুভলং ঝর্ণায় পানি নাই
শুভলং ঝর্ণায় পানি নাই

শুভলং ঝরনায় গিয়ে আমরা হতাশ। পানির ছিটে ফোঁটাও নেই। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে কোন ঝর্না আছে। শুভলং ঝর্ণার একদম কাছে যেতে টিকেট কাটতে হয়। ঝর্ণায় পানি নেই দেখে আমরা আর টিকেট কাটলাম না। বাইরে থেকে গ্রুপ ছবি তুলে আবার ট্রলারে উঠে পড়ি। শুভলং ঝর্না দেখার ইচ্ছাকে আপতত দমন করে আবার রাঙ্গামাটি আসবো প্রতিজ্ঞা করি। (শুভলং ঝর্ণাতে যাওয়া হয়েছিলো, ইচ্ছে মত গোসলও করা হয়েছিলো। সে গল্প অন্য আরেকদিন করা যাবে)

শুভলং ঝর্না ঘুরে আমরা দুপুরের খাবারের জন্য পেদা টিং টিং-এ রওনা হলাম। হঠাৎ মাঝি ভাই এক পাহাড়ের নিচে ট্রলার থামালো। পাহাড় দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না। বেয়ে উঠা শুরু করলাম। আমার সাথে আরো বেশ কয়েকজন ছিলো। কিছুদূর উঠার পর দেখি আরো অনেক দূর উঠা যাবে। আনিস স্যার বলতেছিলো আর উঠার দরকার নেই। উঠার হয়ত কোন শেষ নেই। দেখা যাবে উঠতে আছে তো উঠতেই আছে। আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এটার চূড়া আমি দেখবো। দেখি না কতদূর উঠা যায়।

 

আমরা কয়েকজন তবু উপরে উঠতে থাকলাম। বাকিরা আনিস স্যারের সাথে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলো। কিছুদূর উঠার পর খাড়া ঢালের দেখা মিললো। খাড়া ঢাল দেখে ভেবেছিলাম এখন আর বাকিরা নাও উঠতে পারে কিন্তু কিসের কি সবাই ঢাল বেয়ে উঠা শুরু করলো। আমরা ১২ জন শেষ পর্যন্ত চূড়ায় পৌঁছাই।

পাহাড় জয়ের পর ছবি না তুললে হয়
পাহাড় জয়ের পর ছবি না তুললে হয়

চূড়া উপর থেকে কাপ্তাই হৃদের দৃশ্য অসাধারন। চারপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। আমাদের পাহারা দেওয়ার জন্য ইউসুফ স্যারও চূড়ায় উঠে আসেন। স্যার বলতেছিলেন, “আমি অনেক দেশ ঘুরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের মত এতসুন্দর আর বৈচিত্র্যপূর্ণ অন্য কোন দেশ হয় না। শুধু শুধু মানুষ এত খরচ করে দেশের বাইরে যায়। দেশের এই জায়গাগুলোতে আসুক। দেখুক কত সুন্দর আমাদের দেশ।”

সবাই গ্রুপ ছবি তুলে পাহাড় থেকে নেমে আসলাম। নেমে শুনলাম আরেক কাহিনী। মাঝি ট্রলার রেখে কোথায় যেন গিয়েছিলো। এরমধ্যে ট্রলারের খুটি খুলে ট্রলার অনেক দূরে চলে যায়। পরে আরেক ট্রলারে করে গিয়ে মাঝ লেক থেকে আমাদের ট্রলার উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হয়!

পেদা টিং টিং-এ পৌঁছে এবার খাবার পালা। পাহাড় বেয়ে সবারই অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। ব্যাম্বো চিকেন দিয়ে সবাই পেট ভরে খেলাম। আমাদেরকে দেখানো হলো কিভাবে ব্যাম্বো চিকেন রান্না করা হয়। রান্না করাও হয় বাঁশে, পরিবেশনও বাঁশে।

পেদা টিং টিং রেস্টুরেন্টটি একটা দ্বীপের মধ্যে। কাপ্তাই লেকে এরকম অসংখ্য ছোট বড় দ্বীপ রয়েছে। রেস্টুরেন্টগুলো সব বিভিন্ন দ্বীপে হয়ে থাকে। খাবার খাওয়াও হয় আবার ছোট ছোট দ্বীপও ঘুরে দেখা হয়। এ এক ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা।

খাবার শেষে সবাই পানির দিকে ছুটলো। তুষার আর রনি ভাই স্যারদের অগোচরে গোসল করতে নেমে গেল। বাকিরাও গোসল করতে চাইলে স্যাররা দেখে ফেলায় আর পারে নাই। কয়েকজন দেখলাম পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। আমিও চা নিয়ে তাদের সাথে যোগ দিলাম। পানিতে পা ডুবিয়ে লেকের দৃশ্য দেখতে দেখতে গরম চা খাওয়ার অনুভূতি, “আহা! মধু! মধু!”

পানিতে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি এই স্মৃতি মোবাইলে তুলে রাখতে গিয়েই অঘটন ঘটলো। মোবাইল পানিতে পড়ে গেল। ভাগ্যভালো ছিলো বেশি গভীর পানিতে ছিলাম না। সাথে সাথেই মোবাইল তুলে ফেললাম। ওইদিনের জন্য আমার সেলফি তোলার সমাপ্তি।

সারাদিনের ট্রলার জার্নিটাই ছিলো সবচেয়ে আনন্দের
সারাদিনের ট্রলার জার্নিটাই ছিলো সবচেয়ে আনন্দের

এখন আমরা রাজবন বিহারে যাবো। হঠাৎ করেই লেক মনে হলো যেন সমুদ্রের রুপ ধারন করেছে। বাতাস ও স্রোতের বিপরীতে চলায় ট্রলার অনেক দুলতেছিলো। ট্রলারের সামনে যারা ছিলাম তাদের ঝর্নায় গোসল করার শখ পূরন হয়ে গেলো। সবাই ভিজে একাকার। ট্রলারের ছাদে যারা বসা ছিলো তারাও অনেকে নিচে চলে আসলো। সবার জন্য বেশ ভালো একটা অভিজ্ঞতা ছিলো।

রাজবনের কাছাকাছি এসে পানি শান্ত হয়ে আসলো। আমরা রাজার বাড়ি দেখতে নেমে জানলাম গেটে তালা দেওয়া। ভিতরে প্রবেশ করা যাবে না। তবে ব্রিটিশ আমলের কামান দেখলাম। কাছেই মেলা চলতেছিলো। বিকেলের শেষ আলোয় সবাই কেনাকেটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবাই শাল, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, বিছানার চাদরসহ বাহারি পন্য কেনাকাটা করলো। আমার কোন কেনাকাটা নাই তাই আমি সহ আরো কয়েকজন পিচঢালা পথ দেখে সে পথ দিয়ে কোথায় যাওয়া যায় তার সন্ধানে বের হলাম।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। দিনের আলো কমে চারিদিকে দ্রুতই অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা নামেও হুট করে। আমরা কয়েকজন তখনো পাহাড়ী রাস্তায় হাঁটছি। ছোট ছোট বাঁক নিয়ে সাপের মত রাস্তা এগিয়ে চলছে। ছোটবেলা থেকে তিন গোয়েন্দা পড়ে বড় হয়েছি। কিশোর, মুসা, রবিনের সাথে কোন এক মিশনে যাচ্ছি মনে হচ্ছিলো।

রাস্তার শেষ কোথায় তা জানি না। রাস্তা অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে জানি তবু কেনো জানি হাঁটতেই থাকলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আমি আর তুষার ছাড়া বাকি সবাই চলে গেল। আমরা আরো কিছুক্ষন হাঁটার পর বুঝতে পারলাম ঘোর কাটানো দরকার অনেক দূর চলে আসছি। ফিরতি পথ ধরলাম। সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় হাঁটতে গা ছমছম করতেছিলো। যদি গ্রুপের সাথে না আসতাম তাহলে হয়ত আরো দূর পর্যন্ত যেতাম। জীবনের শেষে কি আছে তা তো জানি না, পথের শেষটাই নাও খুঁজে দেখতাম…

মেলায় এসে দেখলাম তখনো সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। যাদের কেনাকাটা নেই তারা চা-কফি খাচ্ছে। সবার কেনাকাটা শেষে ট্রলারে উঠতে উঠতে রাত হয়ে গেলো। মাঝি ভাই বলে দিলো কেউ ট্রলারের সামনে বসতে পারবে না। রাত হয়ে গেছে সামনে বসলে ঠিকমত দেখা যায় না। ট্রলার ছাড়ার কিছুক্ষন পর আমরা এক অপরূপ দৃশ্যের স্বাক্ষী হলাম।

আজ পূর্নিমা। আকাশ জুড়ে বিশাল এক চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলো লেকের পানিতে পড়ে চারিদিক উজ্জ্বল হয়ে আছে। চাঁদের আলোয় লেকের এই রূপ দেখে পাগল হয়ে গেলাম যেন। মনে হচ্ছিলো বেঁচে থাকার এইতো মানে। এই দৃশ্য দেখার জন্যে হলেও হাজার বছর বেঁচে থাকা যায়। বার বার মনে হচ্ছিলো এ যাত্রা যেন শেষ না হয়।

জন্ম নিলে, মৃত্যু যেমন সত্য। তেমনি প্রতিটা যাত্রার শুরু যেমন আছে তেমনি শেষও আছে। আমাদের যাত্রাও শেষ হলো। আমরা ঘাটে নেমে পড়লাম। আমাদের কয়েকজনের টুকটাক শপিং বাকি ছিলো। আমরা শপিং এ বের হলাম। বাকিরা হোটেলে চলে গেলো। এখানেও কেনার মত কিছু না হয়ে কিছুক্ষন এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে হোটেলে চলে গেলাম।

রাতের খাবারের পর আবার ছাদে আসর বসলো। কেউ গান গাইলো, কেউ কবিতা আবৃতি করলো, কেউ কৌতুক বললো, কেউবা হকার সেজে অভিনয় করে দেখালো। এরপর শুরু হলো মুড়ি পার্টি।

আপন ১২ টা বোম্বাই মরিচ দিয়ে মুড়ি মাখানী বানালো। সেই মুড়ি খেয়ে সবার অবস্থাই খারাপ। পানির খোঁজে সবাই রুমে চলে গেল। হোটেলের লবিতে এরপর আপন নাটক করে দেখালো। ক্লান্ত থাকায় আর কেউ ছাদে গেল না। আমি ১২ টার পর আবার ছাদে উঠলাম। এই পূর্নিমার রাত ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় না।

একটা চেয়ার নিয়ে লেকের দিকে মুখ করে বসে পড়লাম। দূরে লেকের মাঝে জেগে দ্বীপে পানি বাড়ি খেয়ে স্বর্গীয় এক শব্দের সৃষ্টি হচ্ছিলো। পানিতে প্রতিফলিত চাঁদের আলো আর ক্ষনে ক্ষনে বেজে উঠা ঢেউয়ের শব্দ। রাত কখন ভোর হলো টের পেলাম না।

সুবহে সাদেক হতে দেখলাম। ঘুমে তখন চোখ টলমল। তবু ভোরের প্রথম সূর্য দেখার অপেক্ষায় বসে রইলাম। বসে থেকে ভুল করি নি। পুব আকাশ থেকে ধীরে ধীরে উদিত হওয়া সূর্য দেখার জন্য এতটুকু কষ্ট করাই যায়।

রুমে এসেই ঘুম দিলাম। যদিও ঘুমানোর সময় পেলাম মাত্র ১ ঘন্টা…

শেষ পর্বঃ সিএসই ডিপার্টমেন্টাল ট্যুরে রাঙ্গামাটি – ভ্রমণের স্মৃতিকথা (পর্ব-৪.৩)

আপনার মতামত জানান
SHARE